আজ মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২০ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

আপনার ব্যক্তিত্ব ও বয়স কি আপনার কাজের চাপ এবং কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করে?

শিরিন আক্তার : বর্তমান সময়ে আমাদের দৈনন্দিন যান্ত্রিক জীবনে সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি তার মধ্যে অন্যতম হলো কাজের চাপ। অফিসে, আড্ডায়, ঘরোয়া অনুষ্ঠান, এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে একবার না একবার এটা নিয়ে কথা হবেই।

কাজের চাপের সম্ভাব্য যেসব কারণ নিয়ে আমরা কথা বলি সেগুলোর মধ্যে কাজের পরিবেশ, কাজের পরিমাণ, সহকর্মী, ম্যানেজার, গ্রাহক, সেবাগ্রহীতা, এবং অফিস রাজনীতি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু কখনো কি আপনি ভেবেছেন আপনার ব্যক্তিত্বও কাজের চাপকে প্রভাবিত করে? আশ্চর্যজনক শোনালেও গবেষকরা মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং কাজের চাপের মধ্যে কৌতূহলোদ্দীপক সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।

“আমাদের ব্যক্তিত্ব এবং কাজের চাপের মধ্যে কৌতূহলোদ্দীপক সম্পর্ক আছে।” বলেন ডঃ মোঃ রাশেদুল ইসলাম। ব্যক্তিত্বের কোন দিক গুলো সাধারণত জড়িত এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডঃ ইসলাম বলেন, “অনেক দিক জড়িত। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে নেতিবাচক আবেগপ্রবণতা (সাধারণত যেকোনো পরিস্থিতিতে নেতিবাচক আবেগ অনুভব করা, যেমন উদ্বেগ, দুঃখ, রাগ, এবং ভয়), সক্রিয় ব্যক্তিত্ব, স্বভাবগত আশাবাদ, টাইপ-এ ব্যক্তিত্ব (কিছু বৈশিষ্ট্য হল উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিযোগিতামূলকতা, পরিপূর্ণতাবাদ, শত্রুতা, সুশৃঙ্খলতা, কর্মমুখীতা, অতিরিক্ত সাফল্য অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, এবং কম সময়ে আরও বেশি অর্জনের তীব্র ইচ্ছা), বিবেক, বহির্মুখীতা, কোন বিষয়ে একমত হবার ক্ষমতা, মানসিক স্থিতিশীলতা, মানসিক দৃঢ়তা, এবং মানসিক কঠোরতা।”

আমাদের ব্যক্তিত্বের এই দিকগুলো শুধুমাত্র এককভাবে সম্পর্কিত, তা নয়। প্রায় সময় দুই বা তারও বেশী ব্যক্তিত্বের দিকগুলো যুগপৎভাবে আমরা কত বেশী কাজের চাপ অনুভব করব, সেটা নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ডঃ ইসলাম এবং তাঁর সহ-গবেষক খুঁজে পেয়েছেন যেসব মানুষের মধ্যে নেতিবাচক আবেগপ্রবণতা এবং বহির্মুখীতা বেশী, তারা কর্মক্ষেত্রে বেশী কাজের চাপ অনুভব করেন, যার কারণে পরবর্তীতে তারা সহকর্মী এবং ম্যানেজারদের থেকে বেশী খারাপ ব্যবহারের স্বীকার হন।

ব্যক্তিত্ব এবং কাজের চাপের মধ্যে এই সম্পর্ক কিভাবে আমাদের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করে জানতে চাইলে ডঃ ইসলাম বলেন, “এটা নির্ভর করে আপনি কিভাবে কাজের চাপ কে দেখেন।” তিনি বলেন, “অনেক মানুষের কাছে কাজের চাপ তাদের কর্মক্ষমতার চেয়ে বেশী মনে হয়। এরকম পরিস্থিতে এসব মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়।” তিনি আরও বলেন, “আবার অনেক মানুষের কাছে কাজের চাপ সুযোগ হিসেবে আসে। এসব মানুষ মনে করে বেশী কাজের চাপ মানে তাদের বেশী কর্মক্ষমতা দেখানোর সুযোগ, যেটা ভবিষ্যতে বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক সুবিধা পাওয়াকে ত্বরান্বিত করে।”

“আমাদের ব্যক্তিত্ব কর্মক্ষেত্রে আমাদের জন্য সুযোগ হারানো কিংবা নতুন সুযোগ তৈরি করার একমাত্র উপায় যেটা সম্পূর্ণরূপে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি,” শেষে যোগ করেন ডঃ ইসলাম।

পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে সারাবিশ্বে বয়স্ক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সংখ্যা বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিক ২০২৪ সালের এক গবেষণায় খুঁজে পেয়েছে যে, সেদেশের কর্মক্ষেত্রে বর্তমানে ৩৪.৪% কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা হচ্ছেন ৫৫ এবং তার বেশী বয়সের। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্প্রতি দেশেও চাকরিতে প্রবেশের এবং অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে কর্মক্ষেত্রে বয়স্কদের উপস্থিতি বাড়াতে সাহায্য করছে।

যেহেতু কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বয়সের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা কাজ করেন, তাদের বয়সও তাদের কাজের চাপ এবং কর্মক্ষমতাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। তবে, এই প্রভাব নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের উপর। ডঃ ইসলাম বলেন, “এটা আসলে নির্ভর করে কাজের ধরনের উপর। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন চাকরির নিরাপত্তা নেই, এরকম পরিস্থিতিতে বয়স্ক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা তরুণ কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের থেকে বেশী কাজের চাপ অনুভব করেন। অন্যদিকে, যখন সমস্যা সমাধান করতে হবে এবং সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে, এরকম পরিস্থিতিতে বয়স্ক কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা তরুণ কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের থেকে কম কাজের চাপ অনুভব করেন।” ডঃ ইসলাম আরও বলেন, “তবে নির্দিষ্ট কাজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ‘বয়স’ ব্যাপারটিকে গুরুত্বহীন করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মী যিনি ৩৫ বছর বয়সী এবং প্রায় ৭-৮ বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, তার কাজের চাপ বেশী হবে একজন ৪৮ বছর বয়সী কর্মীর তুলনায় যিনি মাত্রই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছেন, এটা আশা করা যায় না। এখানে বয়স নয়, দীর্ঘ সময় ধরে একই কাজ করা এবং অর্জিত অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে!”

যেহেতু বয়সের সাথে কাজের চাপ এবং কর্মক্ষমতার সম্পর্ক কাজের ধরণ, দীর্ঘ সময় ধরে একই কাজ করা, এবং অর্জিত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে, তাই সব-বয়সের সহকর্মীদের সাথে আমাদের কথাবার্তা, আচরণ, ও যোগাযোগ হতে হবে শ্রদ্ধাশীল এবং দায়িত্বশীল। এর গুরুত্ব নিয়ে ডঃ ইসলাম বলেন, “তরুণ এবং বয়স্ক সহকর্মীদের সাথে আমাদের সবসময় শ্রদ্ধাশীল এবং দায়িত্বশীল হতে হবে যাতে আমাদের কোন কথা কিংবা আচরণ তাদেরকে নিরুৎসাহিত না করে কাজের ব্যাপারে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে। একই সাথে আমাদের আরো লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের কোন কথা কিংবা আচরণ যেন তাদের সাথে কর্মক্ষেত্রে আমাদের যে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সামাজিক সম্পর্ক থাকে সেটাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না করে। কারণ একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক এবং ইতিবাচক কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতাকে অনেক গুন বাড়িয়ে দিতে পারে।”

পরিচিতিঃ ডঃ মোঃ রাশেদুল ইসলাম একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, এবং পরামর্শদাতা, যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ভ্যালডসটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল-অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজি পড়ান এবং গবেষণা করেন ব্যক্তিত্ব, কাজের চাপ, কর্মক্ষমতা, টিম, নেতৃত্ব, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, এবং জরিপ নিয়ে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাশফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন সাইকোলজি এবং ম্যাথেমেথিক্সে। পরবর্তীতে রাইট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল-অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজি এবং হিউম্যান ফ্যাক্টরস সাইকোলজিতে।

ডঃ মোঃ রাশেদুল ইসলাম তাঁর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন সোসাইটি ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল-অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজিস্ট (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), এসোসিয়েশন ফর সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), ন্যাশনাল অকুপেশনাল ইনজুরি রিসার্চ সিম্পোজিয়াম (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র), কানাডিয়ান সাইকোলজিক্যাল এসোসিয়েশন (কানাডা), ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অফ ওয়ার্ক অ্যান্ড অর্গানাইজেশনাল সাইকোলজি (চেক রিপাবলিক), এবং ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বিজনেস (গ্রেট ব্রিটেন)।

Share and Enjoy !

Shares