আজ বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ

ভারতে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা এখনো বিশ্বাস করেন, শেখ হাসিনা এখনো বীরের বেশেই দেশে ফিরতে পারবেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৯ দিন বাকি থাকতে এক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে বলা হয়- বাংলাদেশে তাদের পরিচয়, তারা পলাতক অপরাধী, যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার ভিড়ে ঠাসা শপিং মলের ফুড কোর্টে কালো কফি আর ফাস্টফুডের টেবিলে বসে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যস্ত তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে তিনি আকাশপথে ভারতে পালিয়ে যান।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ সময়ে ২০২৪ সালেল জুলাই-অগাস্টে সেই আন্দোলনে দমন-পীড়নে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হন। এরপর সহিংসতা এবং একের পর এক মামলার মুখে শেখ হাসিনার দলের হাজারো নেতা-কর্মী দেশ ছাড়েন। তাদের মধ্যে ৬ শতাধিক বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী কলকাতায় আশ্রয় নেন এবং সেখানেই তারা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে তথ্য দিচ্ছে গার্ডিয়ান।

হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচর চলছে বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে—এমন চিন্তা মাথায়ও আনছেন না শেখ হাসিনা। ওই রায়কে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি ভারতে বসেই প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন এবং এর অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচন ভণ্ডুল করতে হাজার হাজার সমর্থককে ‘উসকানি’ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনটাই বলা হয়েছে গার্ডিয়ানের এই প্রতিবেদনে।

গার্ডিয়ান আরও বলছে যে, ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক গোপন আশ্রয়স্থল থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক ও বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনালাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত সরকারের চোখের সামনেই তার এসব কর্মকাণ্ড চলছে। তাকে প্রত্যর্পণে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করছে ভারত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে নেওয়া হয়েছে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা করার জন্য। ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন তাদের মধ্যে। সাদ্দামকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান লিখেছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা আমাদের নেতা-কর্মী, তৃণমূল নেতৃত্ব ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আসন্ন সংগ্রামের জন্য দলকে প্রস্তুত করছেন।

গার্ডিয়ানকে সাদ্দাম বলেছেন, শেখ হাসিনা কখনো কখনো দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা ফোন কল আর বৈঠক করে কাটান। ‘আমাদের নেত্রী খুব আশাবাদী; তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা মনে করি, শেখ হাসিনা একজন নায়ক হিসেবেই ফিরে যাবেন।’ ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম গার্ডিয়ানকে আরও বলেছেন, ‘আমরা কারাগারের ভয়ে কলকাতায় নেই। আমরা এখানে, কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’

শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের বলছি নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে, সব ধরনের প্রচার ও ভোট বর্জন করতে। এই প্রহসনে কোনোভাবেই অংশ না নিতে বলেছি।’ বাংলাদেশে নানকের বিরুদ্ধেও হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে, সেসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করছেন।

গার্ডিয়ান লিখেছে, বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকে ‘স্বৈরতন্ত্র ও লুটপাটের শাসন’ বলেন, তারা দলটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের নথিপত্র অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভিন্নমত দমন ছিল নিয়মিত ঘটনা। হাজারো মানুষ গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় নিহত হন, যাদের অনেকের ভাগ্য জানা গেছে কেবল শেখ হাসিনার পতনের পর। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন ভেঙে পড়েছিল, আর নির্বাচন পরিণত হয়েছিল প্রহসনে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনূসের অন্তর্র্বতী সরকার দেশকে নতুন গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি। শেখ হাসিনার বিচারও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মানার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নামে দেশে মব আর সহিংসতার ঢেউ উঠেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের শত শত কর্মী হামলার শিকার হয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন বা জামিন ছাড়াই কারাবন্দি রয়েছেন। অনেকেই এখনো আত্মগোপনে।

গার্ডিয়ান লিখেছে, কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবনে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তাদের শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে খুব একটা অনুশোচনা দেখা যায়নি। তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে গণ-অভ্যুত্থান মানতে নারাজ; তাদের দাবি, এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। কলকাতার উপকণ্ঠে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক বিলাসবহুল বাড়ি থেকে কথা বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না। আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সন্ত্রাসীরা ক্ষমতা দখল করেছে।’

গার্ডিয়ান লিখেছে, নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের সাফল্য-ব্যর্থতার ওপর। তাদের দাবি, এ নির্বাচন দেশে স্থিতিশীলতা বা শান্তি আনবে না, আর শেষ পর্যন্ত মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে।

Share and Enjoy !

Shares