আজ মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, ২০ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

দেশে জরুরি অবস্থা জারির চাপ ছিল: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, তবে পদটি মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত।

দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। সেই প্রেক্ষাপটে সংসদ বিলুপ্তির আদেশ দেওয়া, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকারকে শপথ পড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করানোসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন রাষ্ট্রপতি।
সম্প্রতি বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, কিভাবে তিনি দেশি বিদেশি যড়যন্ত্র থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন।
দেশজুড়ে যখন জরুরি অবস্থা জারি ও সামরিক শাসন জারির গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, তখন এমন কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না, এই প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, প্রকাশ্যে বা গোপনে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক আলাপ হয়নি। তবে তাকে জরুরি অবস্থা জারির জন্য বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সেনাবাহিনী সে সময় যে ভূমিকা রেখেছে, তা অবশ্যই স্মরণীয়। তাদের ইচ্ছা থাকলে মার্শাল ল জারি করা সম্ভব ছিল। চাইলে জরুরি অবস্থাও দেওয়া যেত, কারণ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই কেবল তা জারি করতে পারেন। আমাকে বিভিন্ন পর্যায় থেকে জরুরি অবস্থা জারি করতে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল। একই সঙ্গে সে সময় একটি ‘প্রতিবিপ্লবের উদ্যোগ’ ছিল বলেও ইঙ্গিত দেন মহামান্য।

কে বা কারা এ উদ্যোগ নিয়েছিল, এ প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি সরাসরি নাম উল্লেখ না করে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী পক্ষ সক্রিয় থাকে। তাদের তরফ থেকেই অসাংবিধানিক কিছু করার চাপ তৈরি হয়েছিল। আমার কানে বারবার বলা হচ্ছিল, আমি যেন ইমার্জেন্সি দিই।
তবে সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান, তিন বাহিনীর প্রধানই এ ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি। সামরিক আইন জারি, জাতীয় সরকার গঠন কিংবা জরুরি অবস্থা সব ক্ষেত্রেই তারা নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন। বরং নির্বাচন পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেন তারা। রাষ্ট্রপতি জানান, এ কারণে আমি সেসব শক্ত হাতে দমন করতে পেরেছি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল একটি নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম করা। সেনাপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষমতার প্রতি কোনো মোহ সেনাপ্রধানের মধ্যে ছিল না বলে দাবি করে রাষ্ট্রপতি বলেন, অতীত ইতিহাস—বিশেষত বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেন থেকে শিক্ষা নিয়েই তারা ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সময় দীর্ঘমেয়াদি জরুরি অবস্থার কারণে জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

রাষ্ট্রপতির দাবি, জরুরি অবস্থা জারির জন্য তাকেই ‘টার্গেট’ করা হয়েছিল এবং তার ওপর চরম চাপ প্রয়োগ করা হয়। তবে নিজের দৃঢ় মনোবল ও আল্লাহর রহমতে দেশকে সে পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দেশজুড়ে একসময় মব সন্ত্রাসে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অশান্ত। সে সময় কঠোর দমন-পীড়ন উল্টো ফল বয়ে আনতে পারত। শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অন্তর্র্বতী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি বলেন, তারা ইন্ধন দিয়েছে কি না তা নিশ্চিত নন, তবে নীরবতা লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেন, আমি দেখলাম কিছু করে লাভ হবে না। আমি যা চাচ্ছিলাম, তা করতে পারতাম না। অসহায় ছিলাম। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে অবস্থান নেননি বলেও জানান তিনি।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আলোচনা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি একে দুঃখজনক বলে আখ্যা দেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিষয়টি তাকে ব্যথিত করেছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় আইএসআইয়ের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। এটা খুব ভয়ংকর ইঙ্গিত বহন করে বলে জানান তিনি।

বর্তমান সরকারের মব সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ঘুণে ধরার মতো ধরে ফেলেছিল মব কালচার। এ প্রবণতা নিরুৎসাহিত বা বন্ধ করার উদ্যোগকে তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।

সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান ঘোষণা করেছেন, সেটিকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে স্থিতিশীলতা আনতে হলে মবতন্ত্র শক্ত হাতে দমন করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

Share and Enjoy !

Shares