বাংলা নাট্য সাহিত্যের আকাশে এক দীপ্ত নক্ষত্র ছিলেন নাট্যগুরু অধ্যাপক নূরুল মোমেন। ১৯০৮ সালে আলফাডাঙ্গার বুড়াইচ গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব শুধু নিজ জেলার নয়, সমগ্র দেশের, এমনকি আন্তর্জাতিক নাট্যক্ষেত্রেরও আলো হয়ে উজ্জ্বল হয়েছেন। তার পিতা নূরুল আরেফিন ছিলেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক।
শিক্ষাজীবনের শুরু ঢাকা মুসলিম হাইস্কুল থেকে ১৯২৪ সালে ম্যাট্রিক পাস করে। এরপর ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে আই এ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৯ সালে বিএ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এল ডিগ্রি লাভ করে ১৯৩৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন।
নূরুল মোমেন ছিলেন একাধারে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, নাট্যকার ও নির্দেশক, রম্য সাহিত্যিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, আইনজ্ঞ, কলামিস্ট, অনুবাদক, কবি এবং প্রাবন্ধিক। তার নাটক ‘নেমেসিস’ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া ‘যদি এমন হতো’ (১৯৬০), ‘নয়া খান্দান’ (১৯৬২), ‘আলো ছায়া’ (১৯৬২), ‘আইনের অন্তরালে’ (১৯৬৬), ‘শতকরা আশি’ (১৯৬৭), ‘রুপরেখা’ (১৯৬৯) ও ‘যেমন ইচ্ছা তেমন’ (১৯৭০) নাটকগুলো বাংলা নাট্যকলা ও সাহিত্যে চিরস্থায়ী প্রতিভার পরিচায়ক।
১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে যোগদান করেন। ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট (১৯৫৭), আইন বিভাগের ডিন (১৯৬৩), প্রক্টর ও ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সাহিত্য ও নাট্য ক্ষেত্রে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কোলকাতায় সংবর্ধনা (১৯৫৪), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬১), যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল প্লেয়ার্স সংবর্ধনা (১৯৬৪), বৃটেনের থিয়েটার ব্যক্তিত্বদের সংবর্ধনা (১৯৬৬), বাংলাদেশ থিয়েটার নাট্যদলের সংবর্ধনা (১৯৭৭) এবং একুশে পদক (১৯৭৮) লাভ করেন।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অমায়িক, সাদাসিধে ও গ্রামীণ ভাষার প্রতি নিবেদিত একজন মানুষ। তার লেখা জাতি, গোষ্ঠী ও দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক নাট্যক্ষেত্রে সমাদৃত হয়। ১৯৮৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নাট্যগুরু নূরুল মোমেন শুধুমাত্র আলফাডাঙ্গার গরিমার প্রতিনিধি ছিলেন না, তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরন্তন আলোর প্রদীপ, যা আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।